Saturday, 17 January 2026

জলপাই তেলের বিনিময়ে বাসন, পশ্চিম তীরে বেঁচে থাকার লড়াই

 

জলপাই তেলের বিনিময়ে বাসন, পশ্চিম তীরে বেঁচে থাকার লড়াই


এক বোতল জলপাই তেল আর এক কেজি জা’আতারের বিনিময়ে বাসনপত্র—যাতে আমার বাচ্চারা স্কুলে কিছু নিয়ে যেতে পারে।’

বেথলেহেমের এক ফিলিস্তিনি মা, মায়েদের জন্য তৈরি একটি ব্যক্তিগত ফেসবুক গ্রুপে এ কথাটি লিখেছেন। গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে ইসরাইলের নিষেধাজ্ঞা আরো কঠোর হওয়ার পর এমন পোস্ট আর ব্যতিক্রম নয়।


মিডল ইস্ট আই এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

নারীরা এখন আসবাবপত্র, খেলনা, রান্নার সামগ্রী এমনকি সন্তানদের পোশাকও মৌলিক খাদ্যের বিনিময়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনি জীবনের সবচেয়ে সাধারণ খাবার হিসেবে পরিচিত জলপাই তেল ও জা’আতার এখন দারিদ্র্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

ফিলিস্তিনি প্রবাদেও আছে—‘সে তেল আর জা’আতারের ওপর বেঁচে আছে।’

যুদ্ধের আগে এসব ফেসবুক গ্রুপে মূলত অতিরিক্ত পোশাক বা খেলনা বিনিময় হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে সেগুলো দুধ, রান্নার তেল, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য জরুরি আবেদনের মঞ্চে রূপ নিয়েছে।

আজ এসব গ্রুপ পশ্চিম তীরজুড়ে তীব্র জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটের চিত্র তুলে ধরছে।

অর্থনীতি গবেষক ড. হাইথাম ওয়েইদা বলেন, পশ্চিম তীরকে ধীরে ধীরে ক্ষুধা সংকটের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী, ক্ষুধা মানে সম্পূর্ণ অনাহার নয়, বরং ধারাবাহিকভাবে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করতে না পারা। তার মতে, এই অবস্থা এখন পুরো পশ্চিম তীরজুড়েই স্পষ্ট।

গাজার তুলনায় সংকট কম হলেও পশ্চিম তীরের অর্থনৈতিক অবনতি দ্রুত ঘটছে এবং প্রতিদিনই মানুষ তা অনুভব করছে।

অর্থনৈতিক পতন

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিম তীরজুড়ে জীবিকা ও সম্পদের ওপর ইসরাইলি নিষেধাজ্ঞা আরো কঠোর হয়েছে। এতে আগেই দুর্বল ফিলিস্তিনি অর্থনীতি কার্যত ভেঙে পড়েছে।

দারিদ্র্যের হার বেড়ে জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশে পৌঁছেছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো চাহিদা মেটাতে পারছে না।

যুদ্ধের আগে ফিলিস্তিনি অর্থনীতি তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।

প্রথমটি ছিল ইসরাইলে ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের কাজ। পারমিটসহ ও পারমিট ছাড়া ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ শ্রমিক মাসে প্রায় ৪৬০ মিলিয়ন ডলার আয় করতেন, যা বছরে ৫.৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

যুদ্ধ শুরুর পর অধিকাংশ শ্রমিকের ইসরাইলে প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় স্তম্ভ ছিল ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের অভ্যন্তরীণ পর্যটন, যা পশ্চিম তীরের ব্যবসা ও পরিষেবা খাতকে টিকিয়ে রাখত এবং মাসে একই পরিমাণ আয় আনত।

তৃতীয়টি ছিল ক্লিয়ারেন্স রাজস্ব—ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পক্ষে ইসরাইলে সংগ্রহ করা কর, যা মাসে ২৬০ থেকে ৩১০ মিলিয়ন ডলার ছিল।

যুদ্ধের পর এসব আয়ের সিংহভাগ বন্ধ হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক সহায়তাও কমে আসে। ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে আনুমানিক ৭১০ থেকে ৭৭০ মিলিয়ন ডলারে।

এর প্রভাব পড়েছে তাৎক্ষণিকভাবে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপ হওয়া সত্ত্বেও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সরকারি কর্মচারীদের পূর্ণ বেতন দিতে পারছে না।

একই সময়ে ইসরাইলি অবরোধ আরও জোরদার হয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় অফিসের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম তীরজুড়ে সামরিক চেকপয়েন্ট ও ফটকের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৮৯৮টিতে দাঁড়িয়েছে। ফলে বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ চলাচল কার্যত অচল।

ড. ওয়েইদা বলেন, ‘পশ্চিম তীরে যা ঘটছে, তা স্বেচ্ছাসেবী অর্থনৈতিক স্থানচ্যুতি। আমরা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছি, যেখানে ফিলিস্তিনিরা—ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মচারী বা শ্রমিক—আর টিকে থাকতে পারছে না।’

ফিলিস্তিনি পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম তীরে বেকারত্ব প্রায় ২৮ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২৩ সালের তুলনায় জিডিপি কমেছে ১৩ শতাংশ। ভোগ কমেছে ১২ শতাংশ।

জীবন ঝুঁকি নিয়ে কাজের খোঁজ

এই অর্থনৈতিক অচলাবস্থা বহু ফিলিস্তিনিকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইসরাইলে প্রবেশের চেষ্টা করতে বাধ্য করছে। বিশেষ করে রামাল্লাহ অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতা প্রাচীর পার হওয়ার সময় প্রায় প্রতিদিনই গুলি বা মৃত্যুর খবর শোনা যায়।

উত্তর পশ্চিম তীরের কালকিলিয়ার কাছে ইজ্জবেত সুলেমান গ্রামের ৫৮ বছর বয়সী জিহাদ কাজমার ছিলেন তেমনই একজন। নয় সন্তানের এই বাবা কাজ হারিয়ে সঞ্চয় শেষ করেন, সম্পত্তি বিক্রি করেন এবং ঋণে ডুবে যান।

তার ভাই জানান, মৃত্যুর আগে জিহাদ বলেছিলেন—পরিবারের খাবারের জন্য ভিক্ষা করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই।

দেয়াল পার হওয়ার পর তিনি পড়ে যান এবং সেখানেই মারা যান।

ফিলিস্তিনি শ্রমিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইসরাইলে কাজ করতে গিয়ে অন্তত ৩৮ জন ফিলিস্তিনি শ্রমিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১,৫০০ জনেরও বেশি।

সাত সন্তানের জনক সেলিম রজব আল-ফারের স্ত্রী হিবা বলেন, “আমরা এমন অবস্থায় পৌঁছেছিলাম, যেখানে আর খাবার জোগাড় করা বা বাচ্চাদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব ছিল না।”

শেষবার কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে তিনি ইসরাইলি সৈন্যদের হাতে আটক হন। পানি চাইলে তাকে মারধর করা হয় এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

No comments:

Post a Comment

তিন মাসে ১২০০ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন ইসরাইলের

  গত বছরের ১০ অক্টোবর গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই চুক্তি লঙ্ঘন করছে ইসরাইল। যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইসরাইলের হামলায় ...