Saturday, 31 January 2026

শবেবরাতে করণীয় ও বর্জনীয়

শবেবরাতে করণীয় ও বর্জনীয়


শবেবরাত শুধু হালুয়া-রুটির উৎসব নয়, নিজের পরকাল নির্মাণের উপলক্ষ। তাই এ রাতে আমাদের করণীয়গুলোর মধ্যে রয়েছে-‘কিয়ামুল লাইল’ তথা রাতে নফল নামাজ পড়া, কোরআনে কারিমের তিলাওয়াত করা, তাসবিহ-তাহলিল, জিকির-আজকার করা, তাওবা ইস্তেগফার পড়া, কবর জিয়ারত করা, নিজের জন্য, বাবা-মায়ের জন্য, আত্মীয়-স্বজনের জন্য ও সব মুসলমানের জন্য গুনাহ থেকে মাফ চাওয়া, দেশ-জাতির কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করা এবং দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে কান্নাকাটি করে রাত কাটিয়ে দেওয়া। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন— ‘কাঁদো, যদি কাঁদতে না পার তাহলে অন্তত কাঁদার ভান করো।’ কেননা চোখের পানির চেয়ে শক্তিশালী আর কোনো জিনিস নেই। (তারগিব : ৩৩২৮)

এ রাতে আমাদের বর্জনীয়

এ রাতে অযথা ঘোরাফেরা করা, আতশবাজি-পটকা ফোটানো, হইহুল্লোড় করা, অযাচিত আনন্দ-উল্লাস করা, গাড়ি ভাড়া করে এক মসজিদ থেকে অন্য মসজিদে যাওয়া, বিভিন্ন মসজিদে দুই রাকাত করে নামাজ পড়া, কারো ঘুমে বা ইবাদতে সমস্যা করা এবং অতিরিক্ত খাবারদাবার বিশেষ করে হালুয়া-রুটির উৎসব করা।

তাওবার গুরুত্ব

মানুষের জীবন গুনাহে জর্জর। গুনাহ সংঘটিত হওয়া কোনো আশ্চর্য বা অস্বাভাবিক বিষয় নয়; বরং আশ্চর্য হলো গুনাহের ওপর অটল-অবিচল থাকা, তওবা না করা। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা কোরআনে কারিমে বারবার বান্দাকে তাওবার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে—‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো, আন্তরিক তাওবা। আশা করা যায়, তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মন্দ কর্মগুলো মোচন করে দেবেন এবং তোমাদের দাখিল করবেন জান্নাতে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত।’ (সুরা তাহরিম : ৮)

অন্যত্র ইরশাদ করেন—‘মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর সামনে তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সুরা নুর : ৩১)। আরো ইরশাদ হচ্ছে—‘বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা যুমার : ৫৩)

এসব আয়াত থেকে বোঝা যায়, গুনাহর সঙ্গে মানুষের ফিতরাতের সম্পর্ক। গুনাহ করার প্রবণতা মানুষের স্বভাবের মধ্যে রয়েছে। সুতরাং মানুষ থেকে গুনাহ ও অপরাধ সংঘটিত হওয়া আশ্চর্যের বিষয় নয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো গুনাহ করে তার ওপর অবিচল থাকা, তাওবা না করা। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে বারবার ডেকে বলেন, ‘হে আমার বান্দা! তোমরা যারা গুনাহ করে নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তারা আমার রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। তোমরা খাঁটি তাওবা করলে আমি তোমাদের যাবতীয় সব গুনাহ মাফ করে দেব। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।’

মানুষ যত গুনাহই করুক না কেন, যদি মৃত্যুর এক মুহূর্ত আগেও খাঁটি তাওবা করে, তাহলে তার সারা জীবনের সব গুনাহ তিনি মাফ করে দেবেন।

সুতরাং এই মহিমান্বিত রাতকে আমাদের যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া উচিত, তাই সন্ধ্যার আগেই নিজেকে পাক-সাফ করে, পবিত্র পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করে, গায়ে খুশবু মেখে, ইবাদতের উদ্দেশ্যে রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা পাওয়ার জন্য নিজেকে পাক মুক্ত করে নতুনভাবে জীবন গড়ার উদ্দেশ্যে মসজিদ পানে ছুটে চলব ইনশাআল্লাহ।


শবেবরাতে আত্মশুদ্ধির বার্তা


আল্লাহতায়ালা মহিমময়। তার করুণা অপার। তিনি বিমূর্ত সময়কেও দান করেছেন মাহাত্ম্য, করেছেন মহিমান্বিত। বছরের তেমনি একটি মহিমান্বিত সময় হচ্ছে শবেবরাত বা মধ্য শাবানের রাত। আটজন সাহাবি (রা.) থেকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে মধ্য শাবানের রাতের মাহাত্ম্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা মধ্য শাবানের রাতে বিশেষভাবে নজর দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষপোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবন মাজাহ : ১৩৯০; মুসনাদ আহমাদ : ৬৬৪২)

হাদিসটিতে জীবনব্যাপী দুটি বিষয় বর্জনের মাধ্যমে ওই রাতের সাধারণ ক্ষমা লাভের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে— তা হচ্ছে শিরক ও হিংসা। বিষয় দুটি অন্তঃকরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর মহান আল্লাহর কাছে দেহ ও কর্মের পারিপাট্যের চেয়ে আত্মশুদ্ধির মূল্য অনেক বেশি। (আল-কোরআন : ২২/৩৭; সহিহ মুসলিম-২৫৬৪) সুতরাং হাদিসটির মৌলিক শিক্ষা হচ্ছে আত্মশুদ্ধি বা অন্তরের পবিত্রতার।

মানুষের বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গি ও অন্তরের ধারণা তার কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে। সুতরাং স্রষ্টার অধিকার যথাযথভাবে আদায় করতে হলে তাঁর ব্যাপারে অন্তর থাকতে হবে স্বচ্ছ, পরিষ্কার; দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে ইতিবাচক। কিন্তু শিরক হচ্ছে স্রষ্টার ব্যাপারে সৃষ্টির অন্তরের নেতিবাচক ও পঙ্কযুক্ত সর্বনিকৃষ্ট ধারণার নাম। সৃষ্টির অধিকার আদায়ের জন্যও চাই তার ব্যাপারে অন্তরে ইতিবাচক ধারণার উপস্থিতি। কিন্তু হিংসা-বিদ্বেষ, ঘৃণা-শত্রুতা সৃষ্টির প্রতি এমন চূড়ান্ত অবজ্ঞার নাম, যা অধিকার আদায় দূরে থাক, অধিকার নষ্ট করতেই সর্বতোভাবে প্ররোচিত করতে থাকে।

সুতরাং শিরক ও হিংসা-পঙ্কিল হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তি স্রষ্টা এবং সৃষ্টির অধিকারসচেতন থেকে কল্যাণ ও সফলতার পথে এগিয়ে যেতে পারে না। বরং সে তখন তার বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মের মাধ্যমে এমনভাবে অধঃপতনের দিকে যেতে থাকে যে, অপার দয়া ও ক্ষমার আধার মহান স্রষ্টার কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়ারও অযোগ্য করে তোলে নিজেকে।

উল্লিখিত হাদিসের মতো আরেকটি হাদিসে নবীজি (সা.) এই একই কথা বলেছেন, ‘প্রতি সপ্তাহে দুবার-সোম ও বৃহস্পতিবার মানুষের আমল (আল্লাহর দরবারে) পেশ করা হয়। মহান আল্লাহ সেদিন এমন সবাইকে ক্ষমা করে দেন, যারা তার সঙ্গে শরিক করে না। তবে ওই দুই ব্যক্তিকে ক্ষমা করেন না, যারা পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করে। (তাদের সম্পর্কে) বলা হয়, পরস্পর মিলে যাওয়া পর্যন্ত এদের মওকুফ রাখো; পরস্পর মিলে যাওয়া পর্যন্ত এদের মওকুফ রাখো।’ (মুসলিম : ২৫৬৫)

সুতরাং মহান আল্লাহর ক্ষমালাভের জন্য অন্তরকে ন্যূনতম যে পঙ্ক ও কলুষ থেকে পবিত্র রাখা দরকার, তা হচ্ছে শিরক ও বিদ্বেষ। এ দুটি অপরাধের প্রকৃতি, পরিণতি ও ভয়াবহতা নিয়ে কোরআন ও হাদিসে বিভিন্নভাবে আলোচনা এসেছে।

মধ্য শাবানের রাতে ক্ষমা পাওয়ার জন্য হাদিস শরিফে অন্তরকে দ্বিতীয় যে ব্যাধি থেকে পরিশুদ্ধ রাখার শর্তারোপ করা হয়েছে, তা হলো হিংসা-বিদ্বেষ। মুমিনের হৃদয়ে হিংসার ঠাঁই হয় না। কেননা হিংসা ও ঈমান পরস্পরবিরোধী। নবীজি (সা.) বলেন, ‘কোনো বান্দার অন্তরে ঈমান ও হিংসা একত্র হয় না।’ (নাসায়ি : ৩১০৯)।

মুমিন হয় মিত্রতাপ্রবণ। সে ভালোবাসে, তাকেও ভালোবাসা হয়। ‘ওই ব্যক্তির মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই যে মিত্র হয় না এবং যাকে মিত্র বানানো হয় না।’ (মুসনাদ আহমাদ : ২২৮৪০)। দীন তো কল্যাণকামিতার নাম। সব ক্ষেত্রে মুমিনের আদর্শ নবী মুহাম্মাদ (সা.)। তিনি তো প্রাণের শত্রুরও কল্যাণ কামনায় পেরেশান থাকতেন।

মুমিন ও দ্বীনদারের যে হৃদয়বৃত্তির কথা বিবৃত হয়েছে হিংসা তার সম্পূর্ণ বিপরীত বিষয়। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘পূর্ববর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর ব্যাধি—হিংসা ও বিদ্বেষ তোমাদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছে। এই ব্যাধি মুণ্ডন করে দেয়। আমি বলি না যে তা চুল মুণ্ডন করে, বরং দীন মুণ্ডন করে দেয়। যার হাতে আমার প্রাণ তার কসম, মুমিন না হলে তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর একে অন্যকে ভালো না বাসলে তোমরা মুমিন হতে পারবে না।’ (তিরমিজি : ২৫১০)

শিরকের মতোই হিংসার প্রকৃতি। জীবনের সব অর্জন, সব নেকিকে বিনষ্ট করে দেয়। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘আগুন যেমন শুকনো কাঠকে নিঃশেষ করে দেয় হিংসা, তেমনি তার অন্য নেক কর্মগুলো পর্যন্ত ধ্বংস করে ফেলে।’ (আবু দাউদ : ৪৯০৩)। হিংসুকের তাই ক্ষমা হয় না, তার কোনো অর্জন থাকে না।

আমরা যদি শিরক ও হিংসা থেকে হৃদয়কে পবিত্র রেখে স্রষ্টা ও সৃষ্টির হকের ব্যাপারে সচেতন থাকতে পারি, তাহলেই আমরা আমাদের রবের দয়া ও ক্ষমার ধারায় প্রতিনিয়ত সিক্ত হতে থাকব। মুআজ ইবন জাবাল (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) আমাকে সম্বোধন করে বললেন, হে মুআজ, তুমি জানো কি, বান্দার ওপর আল্লাহর কী অধিকার আর আল্লাহর কাছে কী অধিকার বান্দার? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই অধিকজ্ঞাত। নবীজি (সা.) বললেন, ‘বান্দার ওপর আল্লাহর অধিকার হচ্ছে, সে তাঁর ইবাদত করবে, শিরক করবে না। আর আল্লাহর কাছে বান্দার অধিকার হচ্ছে, যে শিরক করবে না তিনি তাকে শাস্তি দেবেন না।’ (বুখারি : ২৮৫৬; মুসলিম : ৩০)

ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যে ব্যক্তি তাওহিদে বিশ্বাসী, নিজের ওপর করেনি শিরকের অত্যাচার, তার জন্য রয়েছে নিরাপত্তা আর সে তো সফলতার মহাসড়কের পথিক।’ (আল-কোরআন : ৬/৮২; সহিহ বুখারি : ৩৪২৯)

তেমনই নবীজি (সা.) আনাস ইবন মালেক (রা.)-কে বলেছেন, ‘বেটা, যদি এমনভাবে দিন অতিবাহিত করতে পারো যে, তোমার হৃদয়ে কারো প্রতি বিদ্বেষ নেই, তাহলে এভাবেই থাকো। বেটা, এটি আমার সুন্নত। আর যে আমার সুন্নতকে জিন্দা করে, সে আমাকে ভালোবাসে। যে আমাকে ভালোবাসে, সে আমার সঙ্গে জান্নাতে থাকবে।’ (তিরমিজি : ২৬৭৮)

মহান আল্লাহর দয়া ও ক্ষমা উপলক্ষ খোঁজে। কখনো বিশেষ সময়ে অগ্রবর্তী হয়ে আমাদের দ্বারে এসে কড়া নাড়ে। আমাদের সে জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। হৃদয়পাত্রকে উপযুক্ত রাখতে হবে সে দান গ্রহণের। উপরের আলোচনা থেকে আমরা জেনে গেছি, আল্লাহর দান শিরক ও হিংসা-পঙ্কিল হৃদয়কে উপযুক্ত পাত্র মনে করে না।

শবেবরাত বা মধ্য শাবানের রাত শুধু সাময়িক কোনো উৎসবী উপাসনা নয়, বরং জীবন-জোড়া এই শুদ্ধতার শিক্ষাই দিতে এসেছে। যেহেতু শিরকমুক্ত অন্তর স্রষ্টার অধিকার এবং হিংসামুক্ত হৃদয় সৃষ্টির অধিকার আদায়ে সর্বত সচেষ্ট থাকে, তাই আমরা যদি শবেবরাতের শিক্ষার আলোকে অন্তরকে শিরক ও হিংসা থেকে মুক্ত রাখতে পারি, তবে আমাদের জীবন হবে পবিত্র, উন্নত এবং মহিমান্বিত।

No comments:

Post a Comment

ভারতের বাজেটে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ ৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি

  ভারতের নতুন অর্থবছরের বাজেটে বাংলাদেশের জন্য অনুদান সহায়তা ৭৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এতে বাংলাদেশকে অনুদান হিসেবে দেওয়ার জন্য ৬০ কোটি রুপি বর...