ভূমিকা
ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বরকতময় রজনীগুলোর মধ্যে শবে বরাত অন্যতম। এই রাত আল্লাহ তায়ালার রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের রাত হিসেবে পরিচিত। তবে শবে বরাতের প্রকৃত ফজিলত তখনই অর্জিত হয়, যখন তা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে যথাযথভাবে পালন করা হয়। সঠিক করণীয় গ্রহণ ও ভুল কাজ বর্জনের মাধ্যমেই এই রাতের তাৎপর্য পূর্ণতা পায়।
শবে বরাতে করণীয় বিষয়সমূহ
১. আন্তরিক তওবা ও ইস্তিগফার
শবে বরাত মূলত ক্ষমা প্রার্থনার রাত। এ রাতে অতীতের সকল গুনাহ স্মরণ করে আল্লাহর কাছে খাঁটি মনে তওবা করা উচিত। শুধু মুখে নয়, বরং ভবিষ্যতে গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্পসহ তওবা করা আবশ্যক।
২. নফল নামাজ আদায়
এ রাতে বেশি বেশি নফল নামাজ আদায় করা উত্তম। নির্দিষ্ট রাকাআত বা নির্দিষ্ট নিয়ম বেঁধে দেওয়া নেই। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দুই রাকাআত করে নামাজ আদায় করা যেতে পারে।
৩. কুরআন তিলাওয়াত
কুরআন তিলাওয়াত আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সর্বোত্তম মাধ্যম। শবে বরাতে কুরআন তিলাওয়াত করলে অন্তর প্রশান্ত হয় এবং আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়।
৪. জিকির ও দরুদ শরিফ
“সুবহানাল্লাহ”, “আলহামদুলিল্লাহ”, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”, “আল্লাহু আকবার” ইত্যাদি জিকির এবং নবী (সা.)-এর উপর দরুদ পাঠ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
৫. দোয়া করা
এই রাত দোয়া কবুলের রাত। নিজের জন্য, পরিবার-পরিজনের জন্য, মৃত আত্মীয়দের জন্য এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনায় দোয়া করা উচিত।
৬. কবর জিয়ারত (সংযমের সাথে)
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) শাবানের মাঝামাঝি রাতে জান্নাতুল বাকি জিয়ারত করেছিলেন। তাই শরিয়তসম্মতভাবে কবর জিয়ারত করা যেতে পারে, তবে বাড়াবাড়ি বা অনৈসলামিক আচরণ পরিহার করতে হবে।
৭. পরদিন রোজা রাখা
শাবান মাসের অধিক রোজা রাখা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ। শবে বরাতের পরদিন নফল রোজা রাখা ফজিলতপূর্ণ।
শবে বরাতে বর্জনীয় বিষয়সমূহ
১. শিরক ও বিদআত
শবে বরাতকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট নামাজ, বিশেষ পদ্ধতির ইবাদত বা মনগড়া আমল প্রচলিত আছে, যার শরিয়তসম্মত প্রমাণ নেই। এসব বিদআত থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।
২. আতশবাজি ও অপচয়
এই রাতে আতশবাজি, ফানুস ও অপ্রয়োজনীয় আনন্দ-উৎসব সম্পূর্ণ অনৈসলামিক। এতে অর্থের অপচয় হয় এবং অন্যের কষ্টের কারণ হয়।
৩. কবর পূজা ও অশুদ্ধ আকিদা
কবরকে কেন্দ্র করে সাহায্য প্রার্থনা, মানত বা অলৌকিক ক্ষমতার বিশ্বাস রাখা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্য কেবল উপদেশ গ্রহণ ও দোয়া করা।
৪. সারা রাত আড্ডা ও অবহেলা
অনেকে এই রাতকে ইবাদতের বদলে গল্প, আড্ডা, মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় নষ্ট করে কাটান, যা এই রাতের মর্যাদার পরিপন্থী।
৫. হিংসা, বিদ্বেষ ও সম্পর্কচ্ছেদ
হাদিসে এসেছে—হিংসুক, বিদ্বেষী ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীরা এ রাতে আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হয়। তাই এসব গুনাহ থেকে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা জরুরি।
৬. ফরজ ও ওয়াজিবে অবহেলা
নফল ইবাদতের আগ্রহে ফরজ নামাজ অবহেলা করা বা শরিয়তের সীমা লঙ্ঘন করা মারাত্মক ভুল।
শিক্ষা ও বাস্তবতা
শবে বরাত আমাদের শেখায়—
-
আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু
-
আত্মসমালোচনা ছাড়া প্রকৃত মুক্তি নেই
-
আমল গ্রহণযোগ্য হয় কেবল ইখলাস ও সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে
শেষকথা
শবে বরাত কোনো উৎসবের রাত নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি, তওবা ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের রাত। সঠিক করণীয় পালন এবং বর্জনীয় বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকলে এই রাত আমাদের জীবন পরিবর্তনের মাধ্যম হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের শবে বরাতের প্রকৃত শিক্ষা উপলব্ধি করে আমল করার তৌফিক দান করেন। আমিন।
No comments:
Post a Comment