" ইসলামের ইতিহাসের জনক " বলতে সাধারণভাবে বোঝানো হয় সেই ব্যক্তিকে, যিনি ইসলামের ইতিহাস সংকলন, সংরক্ষণ ও লেখার প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করেছেন। এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও সম্মানিত নাম হল—
পরিচিতি:
-
পুরো নাম: মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক ইবনে ইয়াসার
-
জন্ম: আনুমানিক ৮৫ হিজরি (৭০৪ খ্রিস্টাব্দ), মদিনা
-
মৃত্যু: আনুমানিক ১৫১ হিজরি (৭৬৮ খ্রিস্টাব্দ), বাগদাদ
-
পেশা: ঐতিহাসিক, জীবনীকার (সীরাত লেখক)
কেন তাঁকে "ইসলামের ইতিহাসের জনক"
বলা হয়?
-
১। সীরাতুন নবী-এর প্রথম সংকলক:ইবনে ইসহাক প্রথম ব্যক্তি যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী এবং ইসলামের প্রারম্ভিক ইতিহাসকে ধারাবাহিকভাবে লিখিত আকারে সংরক্ষণ করেন।
-
২। সীরাত ইবনে ইসহাক:তার সংকলিত বইটি "সীরাতু রাসূলিল্লাহ" নামে পরিচিত। এটি মূলত ইসলামের ইতিহাসের প্রথম পূর্ণাঙ্গ দলিল। যদিও তার মূল রচনাটি আজ আর পাওয়া যায় না, তবুও পরবর্তীতে ইবনে হিশাম তার সংক্ষিপ্ত সংস্করণ সংরক্ষণ করেছেন, যা "সীরাতে ইবনে হিশাম" নামে পরিচিত এবং এখনো ইসলামের ইতিহাস গবেষণায় প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
-
৩। মুখে মুখে প্রচলিত তথ্য লিপিবদ্ধ করা:তিনি সাহাবী ও তাবেয়ীনদের কাছ থেকে মুখে শোনা বর্ণনাগুলোকে সন্নিবেশিত করে ইতিহাস রচনা করেন, যার মাধ্যমে ইসলামের প্রাথমিক যুগের ঘটনাবলী সংরক্ষিত হয়।
অন্যান্য অবদান:
-
বদর, উহুদ, খন্দক প্রভৃতি যুদ্ধে মুসলমানদের অবস্থান ও ঘটনা
-
হিজরত, বাইআত, মক্কা বিজয় ইত্যাদি ঐতিহাসিক ঘটনা
-
রাসূলের বংশ, জন্ম, জীবনধারা, দাওয়াত, হিজরত এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাস
সমালোচনা:
-
কিছু আলেম তার বর্ণনাকে যাচাই-বাছাইহীন মনে করেছেন, তবে তার ইতিহাস লেখার প্রয়াস ছিল পথিকৃৎ।
উপসংহার:
ইবনে ইসহাক-কে ইসলামের ইতিহাসের জনক বলা হয় কারণ তিনি ইতিহাসকে মৌখিক ঐতিহ্য থেকে লিখিত ঐতিহ্যে রূপান্তরিত করেন। তার কাজের ভিত্তিতেই ইসলামের ইতিহাসের পরবর্তী ধারা গঠিত হয়েছে।
আল মাসুদীকেও তো ইসলামের ইতিহাসের জনক বলা হয় ???
আল-মাসউদী-কেও অনেক সময় "ইসলামী ইতিহাসের জনক" বা "আরবি ঐতিহাসিক রচনার পিতা" বলা হয়—তবে প্রেক্ষাপটটা এখানে ভিন্ন।
তাহলে প্রশ্ন আসে:
ইবনে ইসহাক এবং আল-মাসউদী—উভয়কেই কেন ইসলামের ইতিহাসের জনক বলা হয়?
১. ইবনে ইসহাক (৮ম শতাব্দী):
-
তিনি ছিলেন সীরাত লেখার পথিকৃৎ—বিশেষভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী কেন্দ্রিক।
-
তার কাজ ছিল জীবনী ও প্রাথমিক যুদ্ধাবলি সংরক্ষণ।
-
তাঁর রচনাগুলো মূলত ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে ও মৌখিক বর্ণনার উপর ভিত্তি করে।
২. আল-মাসউদী (৮৯৬–৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দ):
-
পুরো নাম: আবু আল-হাসান আলি ইবন আল-হুসাইন আল-মাসউদী
-
তিনি ছিলেন একজন বিশ্বভ্রমণকারী, ইতিহাসবিদ, ভূগোলবিদ ও দার্শনিক চিন্তাবিদ।
-
তাঁর বিখ্যাত বই: "মুরুজ আদ-ধাহাব ওয়া মা'আদিন আল-জাওহার" (স্বর্ণখনি ও রত্নের খনি)
-
তিনি ইতিহাসের বিশ্লেষণ ও তুলনামূলক ব্যাখ্যার সূচনা করেন।
-
ধর্মীয় ইতিহাস ছাড়াও তিনি রাজনীতি, সংস্কৃতি, ভূগোল, সভ্যতা, বিজ্ঞান ও দর্শন-এর ইতিহাসও অন্তর্ভুক্ত করেন।
মূল পার্থক্য:
| দিক | ইবনে ইসহাক | আল-মাসউদী |
|---|---|---|
| সময়কাল | ৮ম শতাব্দী | ১০ম শতাব্দী |
| গুরুত্ব | সীরাত ও ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাস | বিস্তুত ইসলামী ও বিশ্ব ইতিহাস |
| ধরণ | ধর্মীয় ভিত্তিক ইতিহাস | বিশ্লেষণভিত্তিক ও তুলনামূলক ইতিহাস |
| উপাধি | সীরাত সাহিত্যের জনক | আরবি ঐতিহাসিক রচনার জনক |
উপসংহার:
No comments:
Post a Comment