Saturday, 17 January 2026

শবে মিরাজঃ একজন মুমিনের জন্য গুরুত্ব ও তাৎপর্য

মোঃ মোস্তফা কামাল

১৭/০১/২০২৬ ইং



ভূমিকা

ইসলামের ইতিহাসে কিছু রাত রয়েছে, যেগুলো মানবজাতির জন্য আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ ও দিকনির্দেশনার স্মারক। শবে মিরাজ তেমনই এক মহিমান্বিত রাত, যে রাতে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ–কে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করে আসমানি সফরে আহ্বান করেন। এই রাত কেবল একটি অলৌকিক ঘটনার স্মৃতি নয়; বরং একজন মুমিনের ঈমান, আমল ও আত্মিক জীবনের জন্য গভীর শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা বহন করে।


শবে মিরাজ কী ?

‘শবে মিরাজ’ অর্থ মিরাজের রাত। ‘মিরাজ’ শব্দের অর্থ ঊর্ধ্বে আরোহণ এবং ‘ইসরা’ শব্দের অর্থ রাত্রিকালীন ভ্রমণ। ইসলামের পরিভাষায় শবে মিরাজ বলতে সেই রাতকে বোঝায়, যেদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ–কে মসজিদুল হারাম (মক্কা) থেকে মসজিদুল আকসা (বাইতুল মুকাদ্দাস) পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়—যাকে ইসরা বলা হয়। এরপর সেখান থেকে তাঁকে সাত আসমান অতিক্রম করে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত উন্নীত করা হয়—যাকে মিরাজ বলা হয়।


এই ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল নবুওয়তের প্রায় দশম বছরে, এমন এক সময়ে যখন রাসূল ﷺ ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে চরম কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। এই সময়টিকে ইসলামের ইতিহাসে ‘আমুল হুযন’ বা শোকের বছর বলা হয়।


শবে মিরাজের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি

শবে মিরাজের রাতে একাধিক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়। রাসূল ﷺ বুরাকে আরোহণ করে বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছান এবং সেখানে পূর্ববর্তী সব নবী ও রাসূলের ইমাম হিসেবে নামাজ আদায় করেন। এরপর তিনি একে একে সাত আসমানে বিভিন্ন নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সবশেষে সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছে আল্লাহ তাআলার বিশেষ নৈকট্য লাভ করেন। এই রাতেই উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ নির্ধারিত হয়।


একজন মুমিনের জন্য শবে মিরাজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

নামাজের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠাঃ

শবে মিরাজের সবচেয়ে বড় উপহার হলো পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ। নামাজই একমাত্র ইবাদত, যা সরাসরি আসমানে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ফরজ করা হয়েছে। নামাজ একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর সাথে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম। এটি আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম ও গুনাহ থেকে বাঁচার শক্তিশালী হাতিয়ার। এ কারণেই বলা হয়—নামাজ হলো মুমিনের মিরাজ।


ঈমানের দৃঢ়তা ও পরীক্ষার শিক্ষাঃ

মিরাজের ঘটনা মানববুদ্ধিতে কঠিন ও অলৌকিক মনে হতে পারে। তবুও একজন প্রকৃত মুমিন আল্লাহ ও রাসূলের বাণীর প্রতি নিঃশর্ত বিশ্বাস স্থাপন করে। হযরত আবু বকর (রা.) এই ঘটনায় নিঃশর্ত বিশ্বাস স্থাপন করে ‘আস-সিদ্দীক’ উপাধিতে ভূষিত হন। এটি প্রমাণ করে, ঈমান কেবল যুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থার নাম।


কষ্টের পর আল্লাহর সান্ত্বনাঃ

শবে মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল রাসূল ﷺ–এর জীবনের সবচেয়ে দুঃখময় সময়ে। প্রিয়জনদের ইন্তেকাল ও সমাজের নির্যাতনের পর আল্লাহ তাআলা এই মহিমান্বিত সফরের মাধ্যমে তাঁকে সান্ত্বনা ও সম্মান দান করেন। একজন মুমিনের জন্য এতে রয়েছে আশার বার্তা—আল্লাহর পথে ধৈর্য ও অবিচল থাকলে, কষ্টের পর অবশ্যই সাহায্য ও মর্যাদা আসে।


উম্মতের মর্যাদা ও দায়িত্ববোধঃ

মিরাজের রাতে রাসূল ﷺ তাঁর উম্মতের জন্য বিশেষ সুপারিশ করেন। নামাজ প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নির্ধারিত হলেও পরে তা পাঁচ ওয়াক্তে নামিয়ে আনা হয়, অথচ সওয়াব রাখা হয় পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমান। এটি উম্মতে মুহাম্মদীর প্রতি আল্লাহর অসীম দয়া ও ভালোবাসার প্রমাণ। তবে এই সম্মানের সাথে দায়িত্বও জড়িত—ইবাদত ও আমলে যত্নবান হওয়া।


আখিরাতমুখী জীবনবোধঃ

মিরাজের সফরে রাসূল ﷺ জান্নাত ও জাহান্নামের বিভিন্ন দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। এসব দৃশ্য একজন মুমিনকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং আখিরাতই চূড়ান্ত গন্তব্য। তাই একজন সচেতন মুমিন দুনিয়ার মোহে না পড়ে আখিরাতের প্রস্তুতির দিকে মনোযোগী হয়।


শবে মিরাজ থেকে মুমিনের করণীয়

শবে মিরাজ থেকে শিক্ষা নিয়ে একজন মুমিনের উচিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথভাবে আদায় করা, ঈমানকে দৃঢ় করা, গুনাহ থেকে তাওবা করা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা। যদিও এই রাতে নির্দিষ্ট কোনো ফরজ বা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত বিশেষ আমল নির্ধারিত নেই, তবুও নফল ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও আত্মসমালোচনা করা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।


উপসংহার

শবে মিরাজ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আল্লাহর সাথে সম্পর্কই একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। নামাজ, ঈমান, ধৈর্য ও আখিরাতের প্রস্তুতিই হলো শবে মিরাজের মূল শিক্ষা। এই শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে জীবন পরিচালনা করতে পারলেই শবে মিরাজের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব।

No comments:

Post a Comment

তিন মাসে ১২০০ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন ইসরাইলের

  গত বছরের ১০ অক্টোবর গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই চুক্তি লঙ্ঘন করছে ইসরাইল। যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইসরাইলের হামলায় ...