Friday, 20 February 2026

রোজা বিষয়ে যা না জানলে নয়

 

রোজা বিষয়ে যা না জানলে নয়

রহমত, মাগফিরাত আর নাজাতের সওগাত নিয়ে আবার আমাদের মধ্যে ফিরে এলো পবিত্র রমজান। মুমিনের দ্বারে দ্বারে বেজে উঠেছে তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির আগমনী গান। এই মাস শুধু উপবাসের নয়, বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির তরে নিজেকে উৎসর্গ করার এক অনন্য প্রশিক্ষণ। রমজানের এই বরকতময় মুহূর্তগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে রোজার সঠিক নিয়মকানুন ও মাসায়েল জানা অত্যন্ত জরুরি।

যাদের ওপর রোজা রাখা ফরজ

রমজানের চাঁদ উদিত হওয়ার পর প্রত্যেক সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন ও প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান পুরুষ এবং নারীর ওপর পূর্ণ মাস রোজা রাখা ফরজ। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেনÑ‘অতএব তোমাদের মধ্যে যে কেউ এ মাস পাবে, সে যেন এ মাসে রোজা রাখে।’ (সুরা বাকারা : ১৮৫)

রোজার নিয়ত

রোজার নিয়ত করা ফরজ। নামাজ-রোজা ও অন্যান্য আমলের ক্ষেত্রে অন্তরের সংকল্পই হলো নিয়ত। মুখে উচ্চারণ করে বলা জরুরি নয়। তবে অন্তরের নিয়তের সঙ্গে সঙ্গে মুখে উচ্চারণ করে বললেও অসুবিধা নেই।

সাহরি ও ইফতার

সাহরি খাওয়া সুন্নত। পেট ভরে খাওয়া জরুরি নয়; এক ঢোক পানি পান করলেও সাহরির সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, তোমরা সাহরি খাও। কেননা, সাহরিতে বরকত রয়েছে। (মুসলিম : ১০৯৫)

সূর্যাস্তের পর দেরি না করে ইফতার করা মুস্তাহাব। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যতদিন মানুষ দেরি না করে সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের ওপর থাকবে। (বুখারি : ১৯৫৭)

যেসব কারণে রোজা ভেঙে যায়

১. স্ত্রী সহবাস করা।

২. খাবার গ্রহণ করা।

৩. পানীয় গ্রহণ করা।

৪. ভুলে খাওয়া বা পান করার পর রোজা ভেঙে গেছে মনে করে আবার ইচ্ছাকৃতভাবে খাওয়া বা পান করা।

৫. বিড়ি-সিগারেট বা হুঁকা সেবন করা।

৬. কাঁচা চাল, আটার খামির বা একত্রে অনেক লবণ খাওয়া।

৭. এমন কোনো বস্তু খাওয়া, যা সাধারণত খাওয়া হয় না। যেমন—কাঠ, লোহা, কাগজ, পাথর, মাটি, কয়লা ইত্যাদি।

৮. পাথর, কাদামাটি, কঙ্কর, তুলা-সুতা, তৃণলতা, খড়কুটো ও কাগজ গিলে ফেলা।

৯. নিজের থুতু হাতে নিয়ে গিলে ফেলা।

১০. ভুলে স্ত্রী সম্ভোগের পর রোজা ভেঙে গেছে মনে করে আবার স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করা।

১১. বৃষ্টি বা বরফের টুকরো খাদ্যনালির ভেতরে চলে যাওয়া।

১২. দাঁত দিয়ে রক্ত বের হলে যদি তা থুতুর চেয়ে পরিমাণে বেশি হয় এবং কণ্ঠনালিতে চলে যায়।

১৩. মুখে পান দিয়ে ঘুমিয়ে যাওয়া এবং এ অবস্থায় সুবহে সাদিক করা।

১৪. কাউকে জোরজবরদস্তি করে পানাহার করানো।

১৫. ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করা বা বমি আসার পর তা গিলে ফেলা।

১৬. মেয়েদের মাসিক ও সন্তান প্রসবের পর ঋতুস্রাব হলে।

(ফাতওয়া শামি, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ৩৭৫; ফাতওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ১৯৯; ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ১২৭)

যেসব কারণে রোজা ভঙ্গ হয় না

০১. অনিচ্ছাকৃত গলার ভেতর ধুলাবালি, ধোঁয়া অথবা মশা-মাছি প্রবেশ করা।

২. অনিচ্ছাকৃত কানে পানি প্রবেশ করা।

৩. অনিচ্ছাকৃত বমি আসা অথবা ইচ্ছাকৃত অল্প পরিমাণ বমি করা (মুখ ভরে নয়)।

৪. বমি আসার পর নিজে নিজেই ফিরে যাওয়া।

৫. চোখে ওষুধ বা সুরমা ব্যবহার করা।

৬. ইনজেকশন নেওয়া।

৭. ভুলক্রমে পানাহার করা।

৮. সুগন্ধি ব্যবহার করা বা অন্য কিছুর ঘ্রাণ নেওয়া।

৯. নিজ মুখের থুতু, কফ ইত্যাদি গলাধঃকরণ করা।

১০. শরীর ও মাথায় তেল ব্যবহার করা।

১১. ঠান্ডার জন্য গোসল করা।

১২. মিসওয়াক করা। যদিও মিসওয়াক করার দরুন দাঁত থেকে রক্ত বের হয়। তবে শর্ত হলো গলার ভেতর না পৌঁছানো।

১৩. ঘুমের মাঝে স্বপ্নদোষ হলে।

১৪. স্ত্রীলোকের দিকে তাকানোর কারণে কোনো কসরত ছাড়া বীর্যপাত হলে।

১৫. স্ত্রীকে চুম্বন করলে, যদি বীর্যপাত না হয় (রোজা না ভাঙলেও এটা রোজার উদ্দেশ্যের পরিপন্থী)।

১৬. দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা গোশত খেয়ে ফেললে (যদি পরিমাণে কম হয়), পরিমাণ বেশি হলে রোজা ভেঙে যাবে।

(মুসান্নাফে আব্দুর রাজজাক ৪/৩১৩, দুররে মুখতার ৩/৩৭৩, ফাতহুল কাদির ২/৩৪৭, হিন্দিয়া ১/২০৩)

আল্লাহতায়ালা সবাইকে সঠিকভাবে রমজানের রোজা রাখার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের ইবাদতগুলো কবুল করে নিন। আমিন।

No comments:

Post a Comment

রমজানের শিক্ষা যেন ভুলে না যাই

এক মাস সিয়াম সাধনার পর মুসলমানদের জীবনে আসে আনন্দের বার্তা নিয়ে ঈদুল ফিতর। পুরো রমজানে রোজা, নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা এবং আত্মসংযম...