
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ৪১ দফা নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রাজধানীর বনানীতে শেরাটন হোটেলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এই ইশতেহার ঘোষণা করেন।
এসময় আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, চীন, পাকিস্তান, কসোভো, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ব্রুনাই, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ, ইরান, কানাডা, আলজেরিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ কোরিয়া, ভুটান, সুইজারল্যান্ড, স্পেন, ব্রাজিল, ভ্যাটিকান, জাতিসংঘ, ইউএনডিপি, আইআরআই, এনডিআই, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল, এমএলও সহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও কূটনীতিবিদগণ উপস্থিত ছিলেন।
এতে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও সাবেক এমপি মাওলানা আ.ন.ম শামসুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সিনিয়র সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন পেশার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে জনপ্রত্যাশা বাস্তবায়নে বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা ও সাধারণ মানুষের মতামত নিয়ে তৈরি করা ইশতেহারে ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।
‘একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয়ে ‘চলো সবাই একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে ইশতেহারে ১০টি মৌলিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে ৫টি হ্যাঁ এবং ৫টি না রয়েছে। হ্যাঁ-এর মধ্যে রয়েছে সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান। না-এর মধ্যে আছে- দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজি।
‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতিসহ ইনসাফ ও ন্যায়ভিত্তিক বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং নারীর ক্ষমতায়ন ও যুবকের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি রয়েছে ইশতেহারে।
ইশতেহার প্রণয়নে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পেশার ২৫০-এর বেশি বিশেষজ্ঞের সমন্বয় তৈরি করা জনগণের মতামতকেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ‘জনতার ইশতেহার’ নামে একটি ওয়েবসাইটে সাধারণ মানুষের মতামত চাওয়া হলে বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় চল্লিশ হাজার মতামত দেন ও তাদের প্রত্যাশার কথা জানান। ওয়েবসাইটে দেয়া মানুষের প্রত্যাশা ও মতামতকে ইশতেহারে গুরুত্ব পেয়েছে।
নির্বাচনি ইশতেহারে যে ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দেবে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী সেগুলো হলো-
১. ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’- এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন।
২. বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন।
৩. যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের প্রাধান্য দেয়া।
৪. নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন।
৫. আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ।
৬. প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন।
৭. প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সকল ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ।
৮. ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খাত সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বান্ধব টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ।
৯. সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করে সু-সংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা।
১২. কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা।
১৩. ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ‘তিন শূন্য ভিশন’ (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বর্জ্যের শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা) বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ গড়া।
১৪. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপক শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরি।
১৫. শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ, বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করা।
১৬. প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সব অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
১৭. সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয় বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সকলের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা।
১৮. আধুনিক ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান (Universal Healthcare System) এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
১৯. সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা।
২০. দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা।
২১. যাতায়াত ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা।
২২. নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন নিশ্চিত করা।
২৩. ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা।
২৪. সার্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা-ব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সব নাগরিকদের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
২৫. সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সু-শাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
২৬. সব পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন।
No comments:
Post a Comment