Wednesday, 11 March 2026

মা-বাবার সেবায় জান্নাত কিনুন এ মাসে


মা-বাবার সেবায় জান্নাত কিনুন এ মাসে

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ওই ব্যক্তির নাক মলিন হোক, যার কাছে আমার কথা আলোচনা করা হলো অথচ সে আমার ওপর দরুদ পাঠ করল না। ওই লোকের নাক মলিন হোক, যার কাছে রমজান মাস এলো, তারপর তাকে ক্ষমা করার পূর্বেই রমজান শেষ হয়ে গেলো, অথচ সে ক্ষমাপ্রাপ্ত হলো না। ওই ব্যক্তির নাক মলিন হোক, যে তার মা-বাবাকে বার্ধক্য অবস্থায় পেয়েও তাকে জান্নাতে নিতে পারল না।’ (তিরমিজি)।

পবিত্র রমজান মাসের সবচেয়ে তিন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা রয়েছে এই হাদিসে। মা-বাবার সঙ্গে সদাচার এবং তাদের হক আদায়ের চেষ্টা তার অন্যতম। হাদিসটিতে মা-বাবার প্রতি করণীয় সম্পর্কে নির্দিষ্ট তেমন কিছু বলা হয়নি। কিন্তু একটি বাক্যে যা বলা হয়েছে, এর মধ্যে কিছু বাকিও থাকেনি! এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মা-বাবাই সন্তানের জান্নাত-জাহান্নাম। তারা খুশি তো আল্লাহ খুশি। আল্লাহ খুশি তো জান্নাত আপনার ঠিকানা। তারা অখুশি তো আল্লাহ অখুশি। আল্লাহ অখুশি তো জাহান্নাম থেকে রেহাই নেই।

এই হাদিস আরো বলছে, রমজান মাসটি অনেক নেক আমলের পাশাপাশি মা-বাবার খেদমত করে জান্নাত কিনে নেওয়ারও মাস। আমাদের চেষ্টা করা উচিত সম্ভাব্য সব উপায়ে মা-বাবার সেবা ও খেদমত করে নিজের জান্নাত কিনে নেওয়া। মা-বাবার সেবায় শুধু মরণের পর জান্নাত মেলে না, পার্থিব জীবনে আমাদের ব্যক্তিগত সাফল্যও নির্ভর করে অনেকটা তাদের দোয়ার ওপর।

একদিন ছেলেকে আহ্লাদ করতে দেখে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের উদ্দেশে তার মা বললেন, শিশুসুলভ আচরণ করো না। তুমি এখন রাষ্ট্রপ্রধান। তোমার পক্ষে আমার কদমবুছির জন্য নিচু হওয়া শোভন নয়। তুর্কি প্রেসিডেন্ট সহাস্যে বললেন, আচ্ছা, প্রেসিডেন্টদের জন্য কি জান্নাত হারাম করে দেওয়া হয়েছে? কে বলবে, মায়ের প্রতি এমন নিখাদ ভালোবাসাই হয়তো একদিনের সাধারণ পরিবারের এরদোয়ানকে আজকের এই অবস্থানে এনেছে।

আমরা আরো মনে করতে পারি, ঢাকা উত্তরের সাবেক মেয়র মরহুম আনিসুল হকের কথাও। তার মৃত্যুর পর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে দেওয়া এক বক্তৃতার ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। সেই বক্তৃতায় তিনি নিজের ও তার সেনাপ্রধান ভাইয়ের জীবনে ক্যারিয়ার-সাফল্যের গোপন রহস্য হিসেবে তুলে ধরেছেন মা-বাবার দোয়ার কথা। তরুণদের সামনে তিনি জীবনে সাফল্যের জন্য মা-বাবার দোয়ার অপরিহার্যতা তুলে ধরেছেন আবেগ ও চিন্তা জাগানিয়া ভঙ্গিতে।

পৃথিবীতে স্রষ্টা মহান আল্লাহর পর সবচেয়ে আপন হলেন মা-বাবা। এবার দেখুন, সেই মহান আল্লাহ কী বলছেন তাদের সম্পর্কেÑ‘তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাকে ছাড়া অন্য কারো এবাদত করো না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উহ’শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না এবং বলো তাদের শিষ্টাচারপূর্ণ কথা। তাদের সামনে ভালোবাসার সঙ্গে, নম্রভাবে মাথানত করে দাও এবং বল : হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা ইসরা : ২৩-২৪)

উপর্যুক্ত আয়াতে স্রষ্টা আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন জন্মদাতা মা-বাবার জন্য আমরা কীভাবে দোয়া করব : ‘বলো, রব্বির হামহুমা কামা রব্বাইয়ানি ছগিরা। অর্থাৎ, হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।’কে না জানে দোয়াটি? কিন্তু আমরা কজন উপলব্ধি করি ছোট্ট এ বাক্যের গভীর মর্ম? সন্তানের জন্য মা-বাবার কী ত্যাগ আর কত বিশাল অবদান, তা আসলে ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়। এমনকি খোদ মা-বাবারও মনে থাকে না কী কষ্ট আর ত্যাগের মধ্য দিয়ে তারা সন্তানকে বড় করে তুলেছেন।

আমাদের প্রথম সন্তানটির বয়স এখন সাত বছর। দ্বিতীয় সন্তানের চলছে সাত মাস। ছেলেটিকে মানুষ করতে গিয়ে রোজ মনে পড়ছে মেয়েটির কথা। ওর জন্যও তো আমরা এমন মাটি কামড়ানো সময় পাড়ি দিয়েছি! নিজেরা সয়ে আসা কষ্টই ভুলে গেছি, তাহলে আমার জন্য বাবা-মা কী করেছেনÑতা আর কতটুকু মনে থাকে। প্রতিদিনই উপলব্ধি গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে, আমার বাবা-মা ত্যাগের কী হিমালয় পাড়ি দিয়েই না বড় করেছেন আমাকে! এসবের দীর্ঘ, অবর্ণনীয় উত্তরই লুকিয়ে আছে ওই ছোট্ট বাক্যের মধ্যেÑ ‘রব্বির হামহুমা কামা রব্বাইয়ানি ছগিরা’।

তাই জীবন গড়ার এই মাসে চেষ্টা করুন আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে নিজ মা-বাবার সন্তুষ্টি অর্জনের। তারা যদি গত হয়ে থাকেন, তবে প্রাণ খুলে উচ্চারণ করুন আল্লাহর শিখিয়ে দেওয়া ওই ছোট্ট দোয়াটি।

No comments:

Post a Comment

রমজানে পাপমুক্ত জীবনের অনুশীলন

  ছবি: সংগৃহীত রমজান পুণ্য অর্জনের মাস। আমরা প্রত্যেকেই রমজানে বছরের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি ইবাদতে মনোনিবেশ করি। সাধ্যমতো সবাই চেষ্টা করি এ...